৯ লাখ টাকার মুচলেকায় মুক্তি
ছাত্রলীগ বরকে বিয়ের আসরে গণপিটুনি
কনের পরিবার বলছে প্রতারণা, বরপক্ষ বলছে ষড়যন্ত্র। বিয়ে নয়, শেষমেশ হলো সালিশি নাটক।

বিয়ের সাজে ছিলেন বর। চারপাশে আলো, আত্মীয়স্বজন, আর গায়ে হলুদের রেশ। কিন্তু হঠাৎই সে বিয়ের আসর বদলে গেল উত্তপ্ত গণপিটুনির মঞ্চে। বরের শেরওয়ানি খুলে জ্বালিয়ে দেয়া হলো আগুনে, আর পুরো ঘটনা রূপ নিলো এক নাটকীয় গ্রাম্য সালিশে। যেখানে শেষ পর্যন্ত বরকে ৯ লাখ টাকা জরিমানায় ছাড়া পেতে হয়।
ঘটনাটি ঘটেছে টাঙ্গাইলের মির্জাপুর উপজেলার বাঁশতৈল ইউনিয়নের কটামারা গ্রামে, বুধবার (২ এপ্রিল) দুপুরে।
কাবিন হয়েছিল আগেই, কিন্তু বিশ্বাস গড়েনি
বর শরীফ মাহমুদ, পরিচিত মুখ, একসময় নিষিদ্ধ জঙ্গি ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তার বাড়ি মির্জাপুর উপজেলার উত্তর পেকুয়া গ্রামে। আর কনে শিলা আক্তার কটামারা গ্রামের মেয়ে।
স্থানীয়রা জানান, এক বছর আগে দুই পরিবারের সম্মতিতে ৬ লাখ টাকা কাবিনে বিয়ে ঠিক হয়। তবে এরপর থেকেই শুরু হয় নানা গড়িমসি, দোটানার রাজনীতি। এলাকার মাতব্বরেরা বহুবার সালিশ বসান, বুঝিয়ে সুজিয়ে অবশেষে কনের পরিবার বিয়েতে রাজি হয়।
গায়ে হলুদের রঙ বদলে গেল উত্তেজনায়
১ এপ্রিল গায়ে হলুদ, ২ এপ্রিল বিয়ের দিন। বরযাত্রী আসেন সময়মতো। কিন্তু এরপরই ঘটে বিপত্তি। কনে পক্ষের অভিযোগ—বর নিজেই বিয়ে ভাঙতে উঠেপড়ে লেগেছিলেন। প্রশাসনের ভয় দেখিয়ে, বিয়েটিকে ‘বাল্যবিয়ে’ বলে চালিয়ে দেয়ার চেষ্টা চালায় তার পক্ষ। দুই বন্ধু দিয়ে এমন কথা রটানো হয়, যাতে কনে পক্ষ আতঙ্কিত হয়ে পড়ে।
সে উত্তেজনাতেই হঠাৎ জনতা বেপরোয়া হয়ে ওঠে। বরকে ঘিরে ধরে মারধর শুরু হয়। রশি দিয়ে বেঁধে রাখার পাশাপাশি তার শরীর থেকে শেরওয়ানি খুলে তা আগুনে পুড়িয়ে দেয়া হয়। এ দৃশ্য দেখতে আশপাশের লোকজন ভিড় জমায়, আর ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়ে পুরো গ্রামে।
সালিশে ৯ লাখ টাকা জরিমানা
ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়লে হস্তক্ষেপ করেন এলাকার রাজনীতিকরাও। বিএনপির স্থানীয় নেতাদের মধ্যস্থতায় বসে এক সালিশি বৈঠক। উপস্থিত ছিলেন ইউপি সদস্য, ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি, সাধারণ সম্পাদকসহ শতাধিক মানুষ। সিদ্ধান্ত হয়—কাবিনের ৬ লাখ টাকা ও বিয়ের আয়োজনের ক্ষতিপূরণ মিলিয়ে ৯ লাখ টাকা জরিমানা দিতে হবে বরকে। কিছু সময় চেয়ে বরপক্ষ মুচলেকা দেন এবং শেষমেশ মুক্তি পান।
বরপক্ষ বলছে—‘এটা ষড়যন্ত্র’
অন্যদিকে বর শরীফ মাহমুদ ও তার পরিবারের দাবি, আমরা প্রতারক নই, বরং ফাঁদে পড়েছি। কনে পক্ষ ইচ্ছাকৃতভাবে বিয়ে বানচাল করেছে, আমাদের কাছ থেকে জোর করে টাকা আদায় করা হয়েছে।
চেয়ারম্যান যা বললেন
১৩ নম্বর বাঁশতৈল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হেলাল উদ্দিন দেওয়ান বলেন, বিয়ে নিয়ে সমস্যা হয়েছিলো। মেম্বারদের উপস্থিতিতে সালিশ হয়েছে, সিদ্ধান্তও হয়েছে দুই পক্ষের সম্মতিতে। এলাকাবাসীও ছিলেন।
বিয়ে মানে কেবল দুটো জীবন নয়—দুই পরিবার, বিশ্বাস আর সামাজিক বন্ধন। সেখানে জটিলতা থাকলে সেটি কীভাবে মোকাবিলা করা হবে—তা নিয়েই প্রশ্ন জাগছে।
সবার দেশ/কেএম