ট্রাম্পের ‘রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ’: আমাদের চ্যালেঞ্জ ও উত্তরণের পথ

সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট এবং আসন্ন নির্বাচনে রিপাবলিকান দলের প্রধান প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্প বাংলাদেশের পণ্যের ওপর ৩৭% শুল্ক আরোপের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন। এর পেছনের মূলনীতি হলো ‘রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ’ বা পাল্টাপাল্টি শুল্ক নীতি, যা কোনও দেশ আমেরিকান পণ্যের ওপর যে পরিমাণ শুল্ক আরোপ করে, তার ভিত্তিতে সে দেশের পণ্য আমদানির ওপর শুল্ক নির্ধারণ করে।
এ নীতির আওতায় বাংলাদেশের পণ্যের ওপর শুল্ক হার বাড়িয়ে ৩৭% করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে, যা আমাদের তৈরি পোশাক খাতসহ সামগ্রিক অর্থনীতিতে বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে।
সোশ্যাল মিডিয়া ও আওয়ামী প্রপাগান্ডা মিডিয়া ভুল ও মিথ্যা তথ্য মধ্যে ছড়িয়ে জনগনের মধ্যে ইউনূসবিরোধী মনোভাব উস্কে দিচ্ছে।
রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ এবং এর প্রভাব
এ নীতির মাধ্যমে ট্রাম্প প্রশাসন যুক্তি দেখাচ্ছে যে বাংলাদেশে আমেরিকান পণ্য আমদানি করতে হলে ৭৪% শুল্ক, ভ্যাট ও অন্যান্য কর দিতে হয়। তাই আমেরিকা পাল্টাপাল্টি নীতি গ্রহণ করে ৩৭% শুল্ক বসাচ্ছে। একইভাবে, অন্যান্য এশিয়ান দেশের ওপরও উচ্চহারে শুল্ক আরোপ করা হচ্ছে, যেমন: ভিয়েতনাম: ৪৬%, ক্যাম্বোডিয়া: ৪৯%, থাইল্যান্ড: ৩৭%, ভারত: ২৭%, চীন: ৩৪%।
এতে বাংলাদেশসহ বেশ কয়েকটি দেশ অর্থনৈতিকভাবে মারাত্মক চাপে পড়বে। বিশেষত, বাংলাদেশ যেহেতু যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি পোশাক রফতানির ক্ষেত্রে অন্যতম শীর্ষ দেশ, তাই এ শুল্ক বৃদ্ধির ফলে আমাদের প্রতিযোগিতার সক্ষমতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
বাংলাদেশের জন্য সম্ভাব্য বিপদ
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প (RMG) আমাদের মোট রফতানির ৮০% এর বেশি জোগান দেয়। যুক্তরাষ্ট্র এ শিল্পের অন্যতম প্রধান বাজার। এখন ৩৭% শুল্ক আরোপের ফলে সম্ভাব্য যা যা হতে পারে:
- বাংলাদেশি পোশাকের দাম বেড়ে যাবে, ফলে ক্রেতারা বিকল্প হিসেবে অন্য দেশের দিকে ঝুঁকতে পারে।
- পাকিস্তানের শুল্ক ২৯%, ভারতের ২৭% হওয়ায় আমাদের ক্রয়াদেশ সেসব দেশে স্থানান্তর হতে পারে।
- অন্যান্য প্রতিযোগী দেশ যেমন আফ্রিকা, ভিয়েতনাম ও ক্যাম্বোডিয়ার দিকেও ক্রেতারা নজর দিতে পারে।
- বাংলাদেশের রফতানি আয় হ্রাস পাবে, ফলে কর্মসংস্থান হুমকির মুখে পড়বে।
সম্ভাব্য উত্তরণ ও করণীয়
এই সংকট মোকাবিলার জন্য আমাদের সরকার ও নীতি-নির্ধারকদের অতি দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। নিম্নলিখিত কয়েকটি কৌশল অনুসরণ করা যেতে পারে:
১. আমেরিকান পণ্যের ওপর শুল্ক কমানো
আমেরিকা থেকে বেশি পরিমাণ পণ্য আমদানি করার ঘোষণা দেয়া যেতে পারে। এতে পাল্টাপাল্টি শুল্ক কমানোর যৌক্তিকতা তৈরি হবে। এর জন্য:
- জাপানি রিকন্ডিশন্ড গাড়ির পরিবর্তে আমেরিকান নতুন গাড়ি আমদানি শুরু করা যেতে পারে।
- গম, তেল, আটা, চালের মতো আমেরিকান খাদ্যপণ্য শুল্কমুক্ত করা যেতে পারে।
- কনজিউমার গুডস (পেস্ট, শ্যাম্পু, কসমেটিকস) আমদানির শুল্ক কমিয়ে দেয়া যেতে পারে।
২. কৌশলগত কূটনীতি ও আলোচনার উদ্যোগ
যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে বাংলাদেশের বিশেষ বাণিজ্য সুবিধা আদায়ের চেষ্টা করতে হবে। প্রয়োজনে WTO ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক ফোরামে এ শুল্ক বৃদ্ধির বিরুদ্ধে কূটনৈতিক লবি করতে হবে। আশার কথা বিষয়টি অন্তর্বর্তী সরকার খুবই গুরুত্বের সঙ্গেই নিয়েছেন। সেজন্যই বৃহস্পতিবার (৩ এপ্রিল) ব্যাংককে এক সংবাদ সম্মেলনে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম ড. ইউনূসের বক্তব্য তুলে ধরে বলেন, আমরা বিষয়টি গভীরভাবে পর্যালোচনা করছি। যেহেতু এটি আলোচনার মাধ্যমে সমাধানযোগ্য, তাই আমরা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা করবো এবং আমি নিশ্চিত যে আমরা উভয়ের জন্য লাভজনক একটি সমাধানে পৌঁছাতে পারবো।
তিনি আরও বলেন, এখনও আলোচনার প্রাথমিক পর্যায়ে আছি। আমরা এটি পর্যালোচনা করছি এবং আশাবাদী যে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় হবে। বাংলাদেশ সরকার ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করা পণ্যের ওপর আরোপিত শুল্ক পর্যালোচনা করছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) দ্রুততার সঙ্গে এ বিষয়ে কাজ করছে, যাতে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য সম্পর্ক আরও ভারসাম্যপূর্ণ হয়।
আরও পড়ুন <<>> স্বস্তির ঈদযাত্রা, সমন্বিত উদ্যোগের সফল বাস্তবায়ন
৩. বাজার বৈচিত্র্যকরণ
- যুক্তরাষ্ট্রের বিকল্প বাজার যেমন ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকার বাজার সম্প্রসারণ করতে হবে।
- চীনের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে বাণিজ্য সুবিধা বাড়ানো যেতে পারে।
২০২৪ সালে বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ১০.৬ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে রফতানি হয়েছে ৮.৪ বিলিয়ন ডলার মূল্যের পণ্য। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাংলাদেশে রফতানি হয়েছে ২.২ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের রফতানির পরিমান আমদানির প্রায় চার গুন। তাই যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমরা যেসব পন্য খাদ্যশস্য (গম, ভুট্টা, সয়াবিন, যন্ত্রপাতি, লোহা ও ইস্পাত) আমদানি করি সে সব পণ্যের আমদানি শুল্ক কমিয়ে দিতে পারি। প্রয়োজনে সে সব পণ্য যুক্তরাষ্ট্র থেকে কম আমদানি করে বিকল্প দেশও খুঁজতে পারি। আমাদের মূল লক্ষ থাকতে হবে সে দেশে আমাদের রফতানি পণ্য যেমন তৈরি পোশাক, জুতা, টেক্সটাইল সামগ্রী, কৃষিপণ্য যেনো কম শুল্কে প্রবেশিধাকার পায়। বাংলাদেশের জন্য কম গুরুত্বপূর্ণ ও কম ভলিউমের পণ্য ইউএস থেকে আমদানি ক্ষেত্রে আমরা আমদানি শুল্ক কমিয়ে দিতে পারি, যাতে আমাদের রফতানি শুল্কও রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ মেথডে ব্যলেন্সড হয়।
৪. উৎপাদন দক্ষতা বৃদ্ধি ও ব্যয় হ্রাস
- বাংলাদেশের পোশাক খাতে উৎপাদন খরচ কমানোর জন্য নতুন প্রযুক্তি ব্যবহারের দিকে নজর দিতে হবে।
- স্থানীয়ভাবে কাঁচামাল উৎপাদনের সক্ষমতা বাড়াতে হবে।
বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকা শক্তি তৈরি পোশাক খাত। তাই যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শুল্ক নীতি আমাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ সংকট মোকাবিলার জন্য দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। কৌশলগত পরিকল্পনা, কূটনৈতিক প্রচেষ্টা এবং বাণিজ্য নীতিতে পরিবর্তনের মাধ্যমে আমরা এ সংকট কাটিয়ে উঠতে পারি। এখনই যদি আমরা যথাযথ উদ্যোগ নেই, তবে ভবিষ্যতে বড় অর্থনৈতিক ক্ষতির মুখে পড়তে হবে।
৪ এপ্রিল ২০২৫
সম্পাদক