ভারতের চিকেন’স নেক আতঙ্ক, নিরাপত্তা জোরদার
চিকেন’স নেক নিয়ে নতুন উত্তেজনা: ড. ইউনূসের মন্তব্যের পর নিরাপত্তা জোরদার করল ভারত

ভারতের পূর্বাঞ্চলের একটি সরু করিডোর—শিলিগুড়ির ‘চিকেন’স নেক’। অনেকের কাছে এ যেন দেশটির ‘জরায়ু’, আবার কারও কাছে ‘বিপদের মুখ’। চারপাশে চীন, নেপাল, বাংলাদেশ আর ভুটানের মতো দেশ ঘেরা এ করিডোর ভারতকে বিচ্ছিন্ন করে দিতে পারে একটি সামান্য অস্থিতিশীলতাই।
সম্প্রতি বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের একটি বক্তব্যকে ঘিরে আবারও আলোচনার কেন্দ্রে এ করিডোর।
ইউনূসের মন্তব্যেই ঘি ঢালা
সম্প্রতি চীন সফরে গিয়ে ইউনূস বলেন, ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল স্থলবেষ্টিত অঞ্চল, আর বাংলাদেশ হচ্ছে এ অঞ্চলের সমুদ্র প্রবেশাধিকারের অভিভাবক।
তার এ বক্তব্য শুধু কূটনৈতিক আবহেই নয়, সরাসরি ভারতীয় ভূরাজনীতিতে অনুরণন তুলেছে। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস. জয়শঙ্কর এর বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেন, বাংলাদেশ নয়, ভারতই বঙ্গোপসাগরে সর্বোচ্চ উপকূল রেখা অধিকার করে আছে।
নতুন করে নিরাপত্তা জোরদার
‘চিকেন’স নেক’ করিডোরটিকে ঘিরে ভারতের সেনাবাহিনী নতুন করে মোতায়েন ও প্রস্তুতি শুরু করেছে। ত্রিশক্তি কর্পস, যার সদর দপ্তর সুকনায়, ইতোমধ্যে যুদ্ধ-প্রস্তুতি বাড়িয়েছে।
সেনাবাহিনীর প্রস্তুতি:
- রাফায়েল স্কোয়াড্রন মোতায়েন হাশিমারায়
- ব্রহ্মোস সুপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিস্থাপন করিডোরে
- এস-৪০০ ভূমি-থেকে-আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা
- টি-৯০ ট্যাংকের মাধ্যমে লাইভ ফায়ার মহড়া
- নিয়মিত সামরিক মহড়া তিন বাহিনীর সমন্বয়ে
- গোয়েন্দা নজরদারি এবং UAV (ড্রোন) টহল দ্বিগুণ করা হয়েছে
চিকেন’স নেক কী এবং কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
শিলিগুড়ি করিডোর ভারতের মূল ভূখণ্ডকে সংযুক্ত করে উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় ‘সেভেন সিস্টার্স’ রাজ্যগুলোর সঙ্গে। করিডোরটি সবচেয়ে সরু জায়গায় মাত্র ২০-২২ কিলোমিটার প্রশস্ত। পাশেই নেপাল, নিচে বাংলাদেশ, আর উত্তর-উত্তরপূর্বে চীন ও ভুটান।
কোনো ধরনের সীমান্ত উত্তেজনা বা যুদ্ধ পরিস্থিতিতে এ করিডোর অবরুদ্ধ হলে উত্তর-পূর্ব ভারত কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে পারে। এ কারণেই এটি ভারতের জাতীয় নিরাপত্তার সবচেয়ে স্পর্শকাতর অঞ্চলগুলোর একটি।
ভূ-রাজনৈতিক বার্তা ও ভারতের আশঙ্কা
বিশ্লেষকরা বলছেন, ড. ইউনূসের বক্তব্যে শুধু ভারতের ভূখণ্ড নয়, দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের আধিপত্য নিয়েও প্রশ্ন উঠে এসেছে। চীন ও বাংলাদেশের মধ্যে দৃশ্যত ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের ইঙ্গিত ভারতের কূটনৈতিক বৃত্তে আশঙ্কা ও সন্দেহ উসকে দিচ্ছে।
অপরদিকে ভারতের অভ্যন্তরেই উদ্বেগ ছড়িয়েছে—বিশেষত জাতীয়তাবাদী রাজনীতির শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত হিমালয়-পাদদেশীয় রাজ্যগুলোতে।
ভারতের প্রতিক্রিয়া ও সম্ভাব্য কৌশল
ভারত কেবল সামরিকভাবে নয়, কূটনৈতিকভাবেও এখন বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ককে পুনর্মূল্যায়নের পথে হাঁটতে পারে। ইউনূস-মোদি বৈঠকের পর মোদির মন্তব্যে যদিও নিরপেক্ষতা দেখানোর চেষ্টা ছিলো, তবে ইউনূসের ‘সেভেন সিস্টার্স’ ও ‘সমুদ্র প্রবেশাধিকার’ মন্তব্য ভারতের ঐক্যবাদী চেতনার বিপরীতে গেছে বলেই মনে করছেন নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা।
ভবিষ্যতের ইঙ্গিত
বিশ্লেষকরা বলছেন, এটি এখন আর শুধু একটি করিডোর নয়, বরং বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক, চীন-ভারত কৌশলগত প্রতিযোগিতা এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ‘নতুন ভূ-কৌশলগত মেরুকরণ’-এর সূচনা।
‘চিকেন’স নেক’ এখন আর কেবল এক টুকরো মাটি নয়—এটি ভারতীয় জাতীয় নিরাপত্তার নিউরাল পয়েন্ট। আর বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনের হাওয়া সে বিন্দুতে এসে ধাক্কা দিচ্ছে। সামনে হয়তো দক্ষিণ এশিয়ার কূটনীতি আরও বহু পালাবদল দেখতে চলেছে।
সবার দেশ/কেএম