উপন্যাস
আকাশ মেঘলা হলেও হাসে

(পর্ব এগারো)
সস্ত্রীক বাসা থেকে বেরিয়ে যাই। সকালে ঢাকা কলেজ, নিউমার্কেট এর সামনের রাস্তা দিয়ে নীলক্ষেত হয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতর দিয়ে, সচিবালয়ের সামনে দিয়ে যাই। আমাকে বাস এর কাউন্টারের সামনেই নেমে পড়তে হয়। নিউমার্কেটের এ রাস্তার দুই পাশে নীল পলিথিন দিয়ে ছোট ছোট দোকান সাজানো থাকে। সকাল দশটার দিকে শুরু হয় বেচাকেনা, শুরু হয় ফুটপাতে অনেক মানুষের আনাগোনা। শুরু হয় রাস্তার জ্যাম। চলতে থাকে অনেক রাত পর্যন্ত। বছরের পর বছর রাস্তা দখল করে চলেছে এ ব্যবসা। গুলিস্তানের অবস্থা আরো ভয়াবহ।
আমার সহধর্মীনী আমাকে নামিয়ে দিয়ে ষ্টেডিয়ামের ভেতর দিয়ে চলে যায় মতিঝিল, তার অফিসে। আমাকে নামিয়ে দেবার জন্য তাকে প্রতি সপ্তাহে অন্তত পয়তাল্লিশ মিনিট আগে অফিসে যেতে হয়।
বায়তুল মোকাররম মসজিদের সামনেই টিকেট কাউন্টার। সেখান থেকে বাসের টিকেট নিলাম। লাইনে দাঁড়াতেই দেখি আমার কয়েকজন এর সামনে মিনহাজ ভাই, আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের ছাত্র ছিলেন, খুব শান্ত মানুষ। আমাদের দেখা হয় না, কথা হয় না অনেক দিন, অনেক বছর বললেও ভুল হবে না। আমি জানি তিনি একটা বেসরকারী ব্যাংকে আছেন। তিনি আমাকে দেখে কুশল বিনিময় করলেন দূর থেকেই।
লাইনে আমরা দাঁড়িয়ে। খালি বাস আসে না। সকালের রোদ একটু একটু করে বাড়ছে। মেজাজ খারাপ তো আছেই যেহেতু ঢাকার বাইরে প্রতিদিন যেতে হয়। মনে মনে তাদের গালাগাল করি, যারা আমাকে ঢাকার বাইরে পাঠিয়েছে। এর মধ্যে আবার বাস আসছে না। আমার একটা বাজে অভ্যেস আছে সেটা হলো অফিসে আমি দশ থেকে পনর মিনিট আগে যাই, প্রতিদিন। আমার এমন দিনও গিয়েছে যে আমি যাবার পরে অফিস খুলেছে আমাদের অফিসে অফিস সহায়ক। প্রধান কার্যালয়ে ছিলাম যখন তখন সকালে গিয়ে ঠান্ডা মাথায় জটিল কাজ গুলোর ড্রাফট বানাতাম।
বাস চলে এলো। বাস চলে এলেই আমাদের লাইন ভেংগে ফেলার তাড়না কাজ করে। অনেকেই চাকরী করেন। সবাই সময় মতো যেতে চান বিধায় এ তাড়াহুড়ো। ম্যানেজমেন্ট শুনতে চায় না, রিকশার চেইন কেন পড়ে, কেন ট্রাফিক বাস আটকে রাখে নানান উছিলায়, জ্যামে কেন বসে থাকা লাগে, ইত্যাদি। বাস এখানে পাঁচ মিনিটের বেশি থাকে না। ভরে গেলে ছেড়ে দেয়। অফিস টাইম, তাই ভরতে সময় লাগে না। এ রুটে দাঁড়িয়ে কোন যাত্রী নেয় না। বাসের ভেতরের পরিবেশ যাই হোক না কেনো, চলে হাওয়ার বেগে। এক টানেই চলে যায় নারায়ণগঞ্জের সাইন বোর্ড।
মিনহাজ বাসে আমার আগেই উঠেছেন। আমি লাইনে একটু পিছনে ছিলাম। আমার একটু দেরি হলো। ভেতরে উঠেই দেখি আমার জন্য একটা জায়গা রাখা। হাতের ইশার করলেন। পাশাপাশি আমরা বসেছি। অন্যান্য যাত্রীরা এলে বাস ছেড়ে দিলো।
খেয়াল করলাম আমাদের শাখা ব্যবস্থাপক অন্য একটা লাইনে বাসের জন্য দাঁড়িয়ে। প্রতিদিন টানবাজারে অফিস করতে আসাটা তার জন্য আরও বেদনাদায়ক। তিনি বাসা থেকে হেঁটে একটা স্থানে আসেন, বাসে ওঠেন এর পরে আবার কিছুটা রিকশা বা হেঁটে মেট্রোরেল ধরেন। প্রেস ক্লাবে নেমে আবার পায়ে হেঁটে গুলিস্তানে আসেন বাস ধরতে।
-কি খবর? তুমি তো ভাই হাওয়া হয়ে গেলে? কেমন আছো? মিনহাজ ভাই প্রশ্ন শুরু করলেন।
-ভাই, আছি ভালো, অনেক দিন একই পদে আছি, তাই কোথাও যাওয়া হয় না।
-আরে মিয়া, ব্যাংকের চাকরী আছে যে এটাই বেশী, তুমি আবার প্রমোশন চাও।
-জ্বী, এটা ভালো বলেছেন।
-কোন ব্যাংক যেনো, ভুলে গেছি, তবে মনে আছে যে সরকারী কোন একটা।
আমি ব্যাংকের নাম বললাম।
-বাচ্চুর ব্যাংক? মজা করলাম।
এরপর আমাদের ব্যাংক নিয়ে অনেক আফসোস করলেন। কত ভালো একটা ব্যাংক ছিলো। কত ভালো ভালো রেজাল্ট করে এ ব্যাংকে ছেলে মেয়েরা চাকরী করতো। সে সময় তিনি আবেদন করতে পারেননি, প্রভৃতি।
তোমার ছেলে মেয়ে কে কত বড়?
বললাম। আমিও প্রশ্ন করলাম, আপনার গুলো…
তিনি বললেন তার দুই মেয়ে, তার বাসা মাটিকাটা।
আমি চিন্তা করে দেখলাম আমার শাখা ব্যবস্থাপক আর সে একই দিকে থাকে। সেদিকে আমার একটা চলাচল নেই বিধায় আমি ভালো চিনি না, ঢাকা শহর প্রতিদিন তার অবস্থান পরিবর্তন করে, রঙ বদল করে ক্ষণে ক্ষণে।
তোমাদের প্রমোশন আটকে গেছে?
জ্বী ভাই।
তোমার ডিপ্লোমা আছে না?
জ্বী না ভাই?
কী?
জ্বী ভাই।
কেন? দাওনি? নাকি পাস করতে পারছো না। এরা অনেক হারামি যেটা ভালো দেবে পরীক্ষা সেটা পাস করবে না। সেটাই পাস করবে যার আশা তুমি করবে না।
তিনি যোগ করলেন, তুমি পিএইচডি করেছো আর এটা করলে না কেনো? যাই হোক এটা করে ফেলো, এটা তো প্রফেশনাল পরীক্ষা।
আমি বলি ভাই যার কপালে আছে তার এমনিতেই হয় আমাদের ব্যাংকে অনেক জিএম, ডিএমডি আছেন যাদের ডিপ্লোমা নেই।
তিনি আমার দিকে অবাক হয়ে তাকালেন। (চলবে,,,)
লেখক: কথাসাহিত্যিক ও ব্যাংকার