বিমসটেক-এর ষষ্ঠ শীর্ষ সম্মেলনের ফাঁকে ইউনূস-মোদি প্রথম বৈঠক
শেখ হাসিনাকে ফেরত চাইলো ঢাকা
এটা শুধু এক ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রীর প্রত্যর্পণ চাওয়ার প্রশ্ন নয়, বরং এটা এক ক্ষমতাচ্যুত স্বৈরতন্ত্রের চূড়ান্ত বিচার প্রক্রিয়ার সূচনা। যাকে আশ্রয় দিলে আগুন ছড়িয়ে পড়ে, সে আশ্রয় আজ আগুনের মুখে- ব্যাংকক বৈঠকে সে আগুনের আঁচ ভারতের চর্মে গিয়ে ঠেকেছে।

বঙ্গোপসাগরীয় দেশগুলোর আঞ্চলিক সহযোগিতা জোট বিমসটেক-এর ষষ্ঠ শীর্ষ সম্মেলনের ফাঁকে অনুষ্ঠিত একটি দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে নাটকীয় মোড় নেয় বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক। বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির মধ্যকার এ বৈঠকে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী ভারতে পলাতক ফ্যাসিস্ট হাসিনার প্রত্যর্পণ দাবি করে নতুন এক রাজনৈতিক সংকেত দেয় বর্তমান বাংলাদেশ সরকার।
প্রায় ৪০ মিনিট ধরে চলা বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয় শুক্রবার (৪ এপ্রিল) স্থানীয় সময় সকাল ১১টা ১০ মিনিটে। এটি ছিল অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পর ইউনূস ও মোদির মধ্যে প্রথম সরাসরি বৈঠক। বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয় থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে বিমসটেক সম্মেলনের অবকাশে।
প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম সাংবাদিকদের জানান, বৈঠকটি অত্যন্ত গঠনমূলক এবং পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট নানা বিষয়ে ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে।
তবে আলোচনার সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ অংশ ছিলো:
- শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ চাওয়া
- ভারতে বসে উসকানিমূলক বক্তব্য দানের অভিযোগ
- সীমান্তে বিএসএফ কর্তৃক হত্যা
- তিস্তা নদীর পানিবণ্টন চুক্তির অগ্রগতি না হওয়া
- ব্যবসায়িক-বাণিজ্যিক ভারসাম্যহীনতা
শেখ হাসিনা প্রসঙ্গ:
অধ্যাপক ইউনূস ভারতের প্রধানমন্ত্রীকে স্পষ্টভাবে জানান—শেখ হাসিনা বর্তমানে ভারতে অবস্থান করছেন এবং সেখান থেকে বাংলাদেশে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন।
বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, তিনি ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর ভারতে বসে দেশবিরোধী বক্তব্য, বিভ্রান্তিকর ভিডিও বার্তা ও উস্কানি দিয়ে আন্তর্জাতিক মহলের সহানুভূতি অর্জনের চেষ্টা করছেন। এ প্রেক্ষাপটে ভারত সরকারের কাছে তার প্রত্যর্পণ বা অন্তত কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণে নেয়ার আহ্বান জানানো হয়।
ভারতের প্রতিক্রিয়া:
ভারত এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে এ বিষয়ে কোনো বিবৃতি না দিলেও, কূটনৈতিক সূত্রগুলো মনে করছে—ভারতের জন্য এটি এক স্নায়ুযুদ্ধের পরিস্থিতি। কারণ:
- শেখ হাসিনা এক সময় ছিল ভারতের নির্ভরযোগ্য রাজনৈতিক মিত্র।
- এখন তিনি হয়ে উঠেছেন একপ্রকার রাজনৈতিক লায়াবিলিটি।
ভারতের সামনে এখন মূল প্রশ্ন-এক সময়ের মিত্রকে তারা রক্ষা করবে, না নতুন বাস্তবতায় অভিযোজিত হবে?
ইউনূসের কূটনৈতিক বার্তা
অধ্যাপক ইউনূস এ বৈঠকে স্পষ্ট করে দিয়েছেন—বাংলাদেশ আর ‘উপনিবেশিক আচরণ’ সহ্য করবে না। তিস্তা চুক্তি ও সীমান্ত হত্যার মতো ইস্যুতে ভারতের পক্ষপাতদুষ্ট অবস্থান সহ্য না করে, এখন জোরালোভাবে হিসাব চাওয়া হচ্ছে।
রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট
এ বৈঠকের মাধ্যমে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার একটি বার্তা দিলো— যাদের এক সময় পুনর্বাসন করা হয়েছিলো, তাদের ভুলের মাশুল জাতিকে চুকাতে হয়েছে। এবার সে ভুল আর হবে না।
বহু রাজনৈতিক বিশ্লেষক মনে করছেন, এ বৈঠক শুধু কূটনৈতিক দিক থেকেই নয়, ইতিহাসের বিচারে শেখ হাসিনার ‘পলিটিক্যাল অ্যাসাইলাম'–এর এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা।
অতীতের পুনর্বাসনের খেসারত?
বাংলাদেশের রাজনীতিতে পুনর্বাসনের ইতিহাস বেশ রক্তাক্ত:
- ৭৫ পরবর্তী সময়ের সামরিক ছত্রচ্ছায়ায় আওয়ামী পুনর্বাসন
- ৯৬ সালের রাজনৈতিক ডিল, যা পরবর্তীতে 'সিস্টেম হাইজ্যাক'-এ রূপ নেয়
- ২০০৭-এর প্রেক্ষাপটে নিরপেক্ষতা দেখিয়ে আবারো আওয়ামী সুবিধা দেওয়ার ফলাফল—১৪ বছরের একদলীয় শাসনের ভয়াবহতা
- বর্তমান সরকার সে ঐতিহাসিক দায় শোধের লক্ষ্যে দৃঢ় অবস্থান নিচ্ছে বলেই এ প্রত্যর্পণ প্রস্তাব।
ইউনূস-মোদি বৈঠক বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে নতুন মোড় এনে দিয়েছে। এটা শুধু এক সাবেক প্রধানমন্ত্রীর প্রত্যর্পণ চাওয়ার প্রশ্ন নয়, বরং এটা এক ক্ষমতাচ্যুত স্বৈরতন্ত্রের চূড়ান্ত বিচার প্রক্রিয়ার সূচনা। যাকে আশ্রয় দিলে আগুন ছড়িয়ে পড়ে, সে আশ্রয় আজ আগুনের মুখে- ব্যাংকক বৈঠকে সে আগুনের আঁচ ভারতের চর্মে গিয়ে ঠেকেছে। সূত্র: বাসস
সবার দেশ/কেএম