এক কবিতার জন্য বদলে গেলো ঢাবি’র পদোন্নতির বিধি-বিধান
তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠনের কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সভাপতি ভাইয়ের তদবিরে ২০০৫ সালে উচ্চমান সহকারীর চাকরী পান কবিতা। পুরো আওয়ামী জমানা জুড়ে তিনি উচ্চমান থেকে প্রধান সহকারী, সেকশন অফিসার এবং সবশেষ সেকশন অফিসার থেকে সহকারী রেজিস্ট্রার পদে প্রমোশন নেন।

স্বশাসিত স্বাধীন প্রতিষ্ঠান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) রেজিস্ট্রার অফিসের সহকারী রেজিস্ট্রার সুরাইয়া ইয়াসমিন কবিতাকে পদোন্নতি দিতে চট করে বদলে ফেলা হলো বিদ্যমান আইন। একজন মাত্র ব্যক্তির পদোন্নতির চিন্তা মাথায় নিয়ে আইনে পরিবর্তন আইনে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। যদিও ঢাবি প্রশাসনের দাবি করছে, এ আইনের পরিবর্তন ব্যক্তি বিশেষের জন্য করা হয়নি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেপুটি রেজিস্টার নিয়োগ বিধিমালা অনুযায়ী, প্রার্থীকে ন্যূনতম দ্বিতীয় বিভাগ/জিপিএ ৫ স্কেলে ন্যূনতম ৩.৫ এবং সিজিপিএ ৪ স্কেলে ন্যূনতম ৩.০০সহ স্নাতকোত্তর হতে হবে। শিক্ষা জীবনে কোনো স্তরেই তৃতীয় বিভাগ (জিপিএ/সিজিপিএ ১.০০ থেকে ২.০০ এর কম) প্রহণযোগ্য নয়। প্রার্থীকে সরকারি/আধা-সরকারি/স্বায়ত্ত¡শাসিত প্রতিষ্ঠানে প্রশাসনিক কর্মে অফিসার পদে ১৪ বছরের অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। তবে অভ্যন্তরীণ প্রার্থীর ক্ষেত্রে স্নাতকোত্তর যোগ্যতাসহ ১০ বছর অথবা স্নাতক (সম্মান) যোগ্যতাসহ ১২ বছরের অভিজ্ঞতা থাকতে হবে এবং কোনও স্বীকৃত প্রতিষ্ঠান থেকে কমপক্ষে ছয় মাসের কম্পিউটার প্রশিক্ষণসহ কম্পিউটার পরিচালনায় দক্ষ হতে হবে।
বিশ্ববিদ্যালয় সিন্ডিকেট সূত্র জানিয়েছে, গত ২৫ ফেব্রুয়ারি সিন্ডিকেট সভায় শূন্য পদে আবেদনের ক্ষেত্রে বিদ্যমান বিধান নিয়ম পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত হয়। অভ্যন্তরীণ প্রার্থীর ক্ষেত্রে যেকোনও একটি শর্ত শিথিলযোগ্য। বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে এ ধরণের বিধান এটিই প্রথম।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে একাধিক কর্মকর্তা অভিযোগ করে বলেন, কবিতাকে ডেপুটি রেজিস্ট্রার পদে নিয়োগ দিতেই এ শর্ত শিথিল করা হয়। শর্ত শিথিল করে কবিতা আবেদনের যোগ্য হওয়ার পরই রেজিস্ট্রার অফিসে ডেপুটি রেজিস্ট্রার পদে নিয়োগে দেয়া হয় বিজ্ঞপ্তি।
কবিতার জন্য যত যা:
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের অফিসের নিয়োগের অনিয়ম সংক্রান্ত তদন্ত কমিটিতে কোনও নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে অন্য সব যোগ্য ডেপুটি রেজিস্ট্রার থাকা সত্বেও কবিতাকে সদস্য সচিব করা হয়। এসএমটি (সিনিয়র মেনেজমেন্ট টীম) এর মিটিংয়ের ক্ষেত্রেও তার অযাচিত হস্তক্ষেপ ও প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিদের কক্ষে কবিতা যখন তখন যাতায়াত করতেন। ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে ব্যক্তিগত কাজে বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে অফিস স্টাফদের নিয়ে যেতেন কিংবা ব্যক্তিগত কাজে পাঠাতেন।
উল্লেখ্য,তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠনের কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সভাপতি ভাইয়ের তদবিরে ২০০৫ সালে উচ্চমান সহকারী হিসেবে চাকরী পান কবিতা। তবে পুরো আওয়ামী জমানা জুড়ে তিনি উচ্চমান থেকে প্রধান সহকারী, প্রধান সহকারী থেকে সেকশন অফিসার এবং সেকশন অফিসার থেকে সহকারী রেজিস্ট্রার পদে প্রমোশন নেন।
আওয়ামী যুগে নীল দলের শিক্ষকদের সঙ্গে নৈকট্য ছিলো কবিতার। তখন নীলদলের ক্ষমতাশালী শিক্ষকদের হাতে রাখার জন্য দাফতরিক গোপন তথ্য ও নথি আদান প্রদান করতেন তিনি। কিন্তু ৫ আগস্টের পর তিনি চট করেই বদলে ফেলেন নিজেকে। রাতারাতি বনে যান বিএনপি ঘরানার ডাকসাইটে অফিসার। শিক্ষা জীবনে তৃতীয় শ্রেণী থাকা সত্বেও এবং সহকারী রেজিস্ট্রার হিসেবে চাকরির মেয়াদের শর্ত পূরণ না করেও ডেপুটি রেজিস্ট্রার পদ বাগিয়ে নিতে মরিয়া হন ধূর্ত কবিতা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার যোগ্যতা না থাকলেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের নিয়োগ, পদোন্নতি, বদলিসহ সবকিছুতেই কবিতার খবরদারি ছিলো দৃষ্টিকটূরকম। পরিবর্তিত ঢা.বি. প্রশাসনের মদদে কবিতা যেনো অঘোষিত নিয়ন্তা হয়ে উঠেছেন। যারা কবিতার তোষামোদি করতে পারছেন, তাদের অন্যায় দাবীও পূরণ হচ্ছে। অথচ যারা তার পালে হাওয়া দিতে পারছে না তাদের সব ন্যায্য দাবীর বেলায়ও লক্ষ্য করা যাচ্ছে ঢাবি প্রশাসনের গড়িমসি।
এদিকে ডেপুটি রেজিস্ট্রারের এ পদে শুক্রবার নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দেয় ঢা.বি. প্রশাসন। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বিধি মোতাবেক প্রদেয় অন্যান্য ভাতাসহ ৫০,০০০-৭১,২০০/- বেতন স্কেলে (জাতীয় বেতন স্কেল-২০১৫) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রেজিস্ট্রারের অফিসের ১টি শূন্য ডেপুটি রেজিস্ট্রার পদ পূরণের জন্য ৫০ টাকার বিনিময়ে রেজিস্ট্রার দফতরে প্রাপ্তব্য নির্ধারিত ফরমে বাংলাদেশী স্থায়ী নাগরিকদের কাছ থেকে দরখাস্ত আহ্বান করা যাচ্ছে। প্রার্থীকে ন্যূনতম দ্বিতীয় বিভাগ/জিপিএ ৫ স্কেলে ন্যূনতম ৩.৫ এবং সিজিপিএ ৪ স্কেলে ন্যূনতম ৩.০০সহ স্নাতকোত্তর পাশ হতে হবে। শিক্ষা জীবনে কোনো স্তরেই কোনোভাবে তৃতীয় বিভাগ (জিপিএ/সিজিপিএ ১.০০ থেকে ২.০০ এর কম) গ্রহণযোগ্য নয়। প্রার্থীকে সরকারি/আধা-সরকারি/স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে প্রশাসনিক কাজে অফিসার পদে ১৪ বছরের অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। তবে অভ্যন্তরীণ প্রার্থীর ক্ষেত্রে স্নাতকোত্তর যোগ্যতাসহ ১০ বছর অথবা স্নাতক (সম্মান) যোগ্যতাসহ ১২ বছরের অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। কোনও স্বীকৃত প্রতিষ্ঠান থেকে কমপক্ষে ছয় মাসের কম্পিউটার প্রশিক্ষণসহ কম্পিউটার পরিচালনায় দক্ষ হতে হবে।
শিক্ষাগত যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা, কম্পিউটার প্রশিক্ষণ ও অন্যান্য যোগ্যতার (যদি থাকে) সনদপত্রগুলো আবেদনের সঙ্গে সংযুক্ত করতে হবে। গোপনীয় প্রতিবেদন সন্তোষজনক সাপেক্ষে চাকরির অভিজ্ঞতা সম্পন্ন প্রার্থীকে অগ্রাধিধকার দেয়া যেতে পারে। অভ্যন্তরীণ প্রার্থীর ক্ষেত্রে যেকোনও একটি শর্ত শিথিলযোগ্য। রেজিস্ট্রারের অনুকূলে প্রদেয় ১০০০/- (এক হাজার) টাকা মূল্যের পে-অর্ডার/ব্যাংক ড্রাফট এবং সব সার্টিফিকেট ও প্রশংসাপত্রের সত্যায়িত প্রতিলিপিসহ ৮ সেট দরখাস্ত আগামী ১৬ এপ্রিলের মধ্যে রেজিস্ট্রারের (২০৩নং কক্ষে) কাছে পৌঁছাতে হবে। সরকারি/আধা-সরকারি/স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে কর্মরত প্রার্থীদেরকে যথাযথ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে দরখাস্ত করতে হবে।
নাম প্রকাশে আপত্তি জানিয়ে একজন ডেপুটি রেজিস্ট্রার বলেন, কবিতা বর্তমানে যে পদে আছেন (সহকারী রেজিস্ট্রার) সেটি ৭ম গ্রেডের। তিনি সহকারী রেজিস্ট্রার হয়েছেন দুই বছরেরও কম। অথচ সেখান থেকে তিনি ডেপুটি রেজিস্ট্রার হতে চলেছেন, যা চতুর্থ গ্রেডের চাকরি। আর এটি হতে তার প্রয়োজন ৫ থেকে ৬ বছরের অভিজ্ঞতা। এ ছাড়া সব পরীক্ষায় কমপক্ষে দ্বিতীয় শ্রেণি থাকতে হবে। কবিতার সেটি নেই।
এ বিষযে বিশ্ববিদ্যালয়ের মুখপাত্র, প্রো-ভিসি (প্রশাসন) সায়মা হক বিদিশা বলেন, এ সিদ্ধান্ত যদি নেয়া হয়ে থাকে, তাহলে সেটি কোনও ব্যক্তি বিশেষকে উদ্দেশ্য করে নেয়া হয়নি। অনেক সময় নিয়োগের ক্ষেত্রে যোগ্য প্রার্থী পাওয়া যায় না। সেক্ষেত্রে শূন্য পদ পূরণের জন্য শর্ত শিথিল করে নিয়োগ দেয়া হয়।
সবার দেশ/কেএম